AB Live News
ভাঙড়ে শান্তিতে ভোট, আশাবাদী নওশাদ
রাজনৈতিক মানচিত্রে বরাবরই উত্তপ্ত ও সংঘাতপ্রবণ এলাকা হিসেবে পরিচিত দক্ষিণ ২৪ পরগনার ভাঙড় দীর্ঘকাল পর এক নজিরবিহীন ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের সাক্ষী থাকল। বুধবার বিধানসভা নির্বাচনের দিনভর ভাঙড়ের কোথাও শোনা যায়নি পরিচিত বোমার আওয়াজ কিংবা গুলির শব্দ, যা অবাক করেছে খোদ স্থানীয় বাসিন্দা থেকে শুরু করে রাজনৈতিক মহলের একাংশকে। বহু বছর ধরে ভোটের দিনে যে চেনা অশান্তি, রক্তপাত এবং ভয়ের বাতাবরণ ভাঙড়বাসীর সঙ্গী ছিল, এবারের চিত্রটি ছিল তার ঠিক বিপরীত। দিনভর এই এলাকায় নির্বাচন চলল একেবারে উৎসবের মেজাজে। এই শান্তিপূর্ণ পরিবেশের জন্য একদিকে যেমন কেন্দ্রীয় বাহিনীর সক্রিয়তা এবং নির্বাচন কমিশনের কড়া নজরদারিকে কৃতিত্ব দেওয়া হচ্ছে, তেমনই পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্টের (আইএসএফ) চেয়ারম্যান তথা ভাঙড়ের বিদায়ী বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকি শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের একাংশকেও খোঁচা দিয়ে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। ক্যানিং পূর্বের দাপুটে নেতা শওকত মোল্লাকে যখন তৃণমূল ভাঙড়ে প্রার্থী করে পাঠিয়েছিল, তখন অনেকেই আশঙ্কা করেছিলেন যে এবার হয়তো ভাঙড়ের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে নওশাদ এবং শওকতের দ্বৈরথ এবার বুলেটে নয়, ব্যালটেই সীমাবদ্ধ থাকল।
বুধবার সকাল থেকেই নওশাদ সিদ্দিকি গোটা বিধানসভা কেন্দ্রের বুথে বুথে ঘুরে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন। এলাকার বিভিন্ন প্রান্ত পরিদর্শনের সময় কোথাও কোথাও তৃণমূল কর্মীদের স্লোগানের মুখে পড়লেও নওশাদ ছিলেন স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতেই শান্ত ও আত্মবিশ্বাসী। ভাঙড়-১ নম্বর ব্লকের কিছু জায়গায় তাঁকে দেখে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান উঠলে তিনি পাল্টা মেজাজ না হারিয়ে মৃদু হাসিমুখে তা এড়িয়ে যান। এমনকি হালকা মেজাজে কিছু কর্মীকে বলতে শোনা যায়, “মারবে নাকি? তাহলে মারো দেখি দু-ঘা।” যদিও নিরাপত্তারক্ষীরা তাঁকে দ্রুত সরিয়ে নিয়ে যান, তবে কোথাও কোনো শারীরিক সংঘাতের ঘটনা ঘটেনি। বিকেলের দিকে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে নওশাদ দাবি করেন, এবারের নির্বাচন শুধু শান্তিপূর্ণ নয়, এটি একটি ঐতিহাসিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তিনি জানান, বহু বছর পর মানুষ নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পেরেছেন। বিশেষ করে হাতিশালা হাই মাদ্রাসার সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দারা তাঁকে জানিয়েছেন যে, গত ১০ থেকে ১৫ বছর তাঁরা বুথমুখো হতে পারেননি। আজ সেই মানুষগুলোর চোখেমুখে যে স্বস্তি ও আনন্দ দেখা গিয়েছে, তাকেই তিনি আসল বিজয় হিসেবে দেখছেন। নওশাদের দাবি, এবারের শান্তিপূর্ণ নির্বাচনে জনমতের প্রকৃত প্রতিফলন ঘটবে এবং তিনি গতবারের জয়ের ব্যবধান ছাড়িয়ে অন্তত ৫০ হাজারেরও বেশি ভোটে পুনরায় জয়ী হবেন।
নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে নওশাদ নির্বাচন কমিশন, রাজ্য পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানদের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, কড়া নিরাপত্তার ঘেরাটোপ না থাকলে সাধারণ মানুষের মনে ভয় দূর করা সম্ভব ছিল না। তবে সবচেয়ে চমকপ্রদ ছিল তৃণমূলের একাংশকে নিয়ে তাঁর মন্তব্য। নওশাদ বলেন, তৃণমূলের একটি অংশ ইতিবাচক ভূমিকা পালন করেছে এবং শান্তি বজায় রাখতে সহযোগিতা করেছে, যার জন্য তিনি তাঁদের ধন্যবাদ জানাতে কার্পণ্য করবেন না। অবশ্য পরক্ষণেই কিছুটা কটাক্ষের সুরে তিনি যোগ করেন যে, কিছু স্বার্থান্বেষী ‘রাজনীতির কারবারি’ ভাঙড়কে অশান্ত করে নিজের ফায়দা লুটতে চেয়েছিল, কিন্তু এবারের ভোটে সাধারণ মানুষ তাঁদের যোগ্য জবাব দিয়েছেন। ভাঙড়ের প্রতিটি প্রান্তে কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানদের রুট মার্চ এবং স্পর্শকাতর বুথগুলোতে কড়া পাহারার কারণে কোনো পক্ষই বড় ধরনের গোলমাল করার সাহস পায়নি। এমনকি ভোটকর্মীরাও জানিয়েছেন যে, ভাঙড় নিয়ে তাঁদের মনে যে ভীতি কাজ করছিল, ভোটের দিনের পরিস্থিতির সাথে তার কোনো মিল ছিল না। সব মিলিয়ে, রক্তপাতহীন এক দিন পার করে ভাঙড় এখন ফলাফলের অপেক্ষায়, যেখানে নওশাদ সিদ্দিকি জয়ের ব্যাপারে একপ্রকার নিশ্চিত। তবে এবারের ভোট শুধু হার-জিতের লড়াই নয়, বরং এক দীর্ঘকালীন হিংসার সংস্কৃতি থেকে ভাঙড়ের বেরিয়ে আসার পথপ্রদর্শক হিসেবেই ইতিহাসের পাতায় থেকে যাবে।
বিশেষ দ্রষ্টব্য :- এই খবর Khabor Ekhon , দ্বারা আপডেট করা হয়েছে. এই খবরের সম্পূর্ণ দায়িত্ব Khabor Ekhon হবে। www.khaborekhon.in অথবা সম্পাদকমন্ডলীর কোন দায় থাকবে না।

