AB Live News
লুঙ্গি পরায় বুথে বাধা, গাইঘাটায় ভোট দিলেন নাতির প্যান্ট পরে
বাংলার লোকসংস্কৃতি আর সাধারণ মানুষের আটপৌরে অভ্যাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ লুঙ্গি। কিন্তু সেই লুঙ্গি পরাই যে ভোট দেওয়ার পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে, তা বোধহয় দুঃস্বপ্নেও ভাবেননি গাইঘাটার আব্দুল রউফ মণ্ডল। বুধবার গোবরডাঙার কুচুলিয়া এফপি স্কুলের ১৮৯ নম্বর বুথে পোশাক-বিতর্ককে কেন্দ্র করে যে নজিরবিহীন ঘটনার সূত্রপাত হলো, তা কেবল ওই বৃদ্ধ ভোটারকে হেনস্তাই করেনি, বরং নির্বাচনের দিন রাজ্যের রাজনৈতিক উত্তাপকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানদের বিরুদ্ধে ওঠা এই অভিযোগের আঁচ পৌঁছেছে খোদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কান পর্যন্ত, যা নিয়ে প্রকাশ্য জনসভা থেকে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন তিনি।
ঘটনার সূত্রপাত বুধবার সকালে। কুচুলিয়া এলাকার বাসিন্দা আব্দুল রউফ মণ্ডল আর পাঁচটা দিনের মতোই সাদামাটা পোশাকে, পরনে লুঙ্গি জড়িয়েই গিয়েছিলেন নিজের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করতে। কিন্তু অভিযোগ, ভোটকেন্দ্রের গেটে পৌঁছানো মাত্রই তাঁর পথ আটকান কর্তব্যরত কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানরা। আব্দুলের দাবি, তাঁকে স্পষ্ট জানানো হয় যে লুঙ্গি পরে বুথের ভেতরে ঢোকা যাবে না। এই নিয়ে জওয়ানদের সঙ্গে তাঁর এবং স্থানীয়দের বচসা শুরু হলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। অভিযোগ, আব্দুলকে গেট থেকে ঠেলে সরিয়ে দেওয়া হয় এবং তাঁর পোশাক নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করা হয়। অন্যদিকে, কেন্দ্রীয় বাহিনীর পাল্টা দাবি, জওয়ানরা কেবল নিয়মশৃঙ্খলা বজায় রাখার কথা বলেছিলেন, কিন্তু আব্দুলই তাঁদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন এবং ধাক্কাধাক্কি শুরু করেন। লাঠি উঁচিয়ে জওয়ানরা তেড়ে আসেন বলেও অভিযোগ করেছেন ঘটনাস্থলে উপস্থিত অন্য প্রত্যক্ষদর্শীরা।
আবুল হাসেম মণ্ডল নামে এক প্রত্যক্ষদর্শী অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে জানান, “আমাদের এই এলাকায় হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সিংহভাগ মানুষই লুঙ্গি পরেন। এটা আমাদের নিত্যদিনের পোশাক। একজন বয়স্ক মানুষকে শুধুমাত্র পোশাকের দোহাই দিয়ে ভোট দিতে বাধা দেওয়াটা অমানবিক। জওয়ানরা কথা বলার সুযোগই দিচ্ছিল না, বরং লাঠি উঁচিয়ে ভয় দেখাচ্ছিল।” পরিস্থিতি বেগতিক দেখে এবং ভোট দেওয়ার তাগিদে অবশেষে হার মানতে বাধ্য হন আব্দুল রউফ। তিনি বাড়ি ফিরে যান এবং শেষ পর্যন্ত নিজের বছর কুড়ির নাতির প্যান্ট পরে পুনরায় বুথে ফিরে আসেন। আব্দুল বলেন, “অল্প বয়সে প্যান্ট পরতাম, কিন্তু এখন অভ্যাস নেই। বুথে ঢুকতে দিচ্ছে না দেখে বাধ্য হয়ে নাতির প্যান্ট পরে এসে ভোট দিয়ে গেলাম।”
এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই রাজ্য রাজনীতিতে নিন্দার ঝড় ওঠে। নবান্ন থেকে শুরু করে নির্বাচনী প্রচার সভা—সব জায়গাতেই এই ইস্যুটিকে ‘বাঙালির সংস্কৃতিতে আঘাত’ হিসেবে তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেন, “একজন বয়স্ক ভোটার লুঙ্গি পরে গিয়েছেন বলে তাঁকে বের করে দেওয়া হয়েছে। এটা ভাবা যায়? কারোর পোশাক দেখে তাঁকে আটকানোর অধিকার কে দিয়েছে? কেউ লুঙ্গি পরবে না পায়জামা পরবে, সেটা তাঁর ব্যক্তিগত বিষয়। ওই বৃদ্ধকে পরে নাতির প্যান্ট পরে ভোট দিতে যেতে হয়েছে, এর চেয়ে বড় লজ্জা আর কিছু হয় না।” বারাসতের এসডিও (SDO) ভুবনপ্রণীত পাপ্পুলা জানিয়েছেন, পোশাকের কারণে ভোটারকে বাধা দেওয়ার মতো কোনও নিয়ম নির্বাচন কমিশনের নেই। পুরো বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং কেন এমন পরিস্থিতি তৈরি হলো, সে বিষয়ে রিপোর্ট চাওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক মহলের মতে, এই লুঙ্গি-বিতর্ক কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং নির্বাচনের দিনে ভোটারদের মৌলিক অধিকার ও সংস্কৃতির প্রশ্নে এক বড়সড় বিতর্কের জন্ম দিল।
বিশেষ দ্রষ্টব্য :- এই খবর Khabor Ekhon , দ্বারা আপডেট করা হয়েছে. এই খবরের সম্পূর্ণ দায়িত্ব Khabor Ekhon হবে। www.khaborekhon.in অথবা সম্পাদকমন্ডলীর কোন দায় থাকবে না।

