AB Live News
নিঃসঙ্গের শেষযাত্রায় পূজা শর্মা! তবে মনে একটাই প্রশ্ন, কেন এখনও এত মানুষ নিঃসঙ্গতায় মারা যান?

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি, যেখানে প্রতিদিনের ব্যস্ততার ভিড়েই মানুষ ছুটে চলছে নিজের লক্ষ্যে। কিন্তু সেখানে এমন এক কঠিনতম বাস্তবতাও লুকিয়ে আছে, যা অনেক সময় আমাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে যায়। সেই বাস্তবতা হল মৃত্যু। না এ মৃত্যু আর পাঁচটা সাধারণ মৃত্যুর মতো নয়। বরং অসংখ্য নিঃসঙ্গ মানুষের মৃত্যু, যাদের শেষ বিদায় জানানোর মতো কেউ থাকে না। হাসপাতালের মর্গেই দিনের পর দিন পড়ে থাকা অজ্ঞাতপরিচয় দেহ, কিংবা রাস্তার ধারে পরিত্যক্ত লাশ। অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি এই সব নিঃসঙ্গতার গল্প যেন শহরের ভয়াবহ দিকটিকে তুলে ধরে। কিন্তু এই অন্ধকারের মধ্যেই সাহস করে আলোর পথ খুঁজে নিয়েছেন এক তরুণী পূজা শর্মা। আর হয়ে উঠেছেন দশভুজা।
মাত্র ছাব্বিশ বছর বয়সেই পূজা শর্মা নিজেকে এমন এক কাজের সঙ্গে যুক্ত করেছেন, যা অনেকের কাছে কল্পনার চারপাশে আসে না। গত চার বছরে তিনি একা হাতে ৬০০০-এরও বেশি বেওয়ারিশ মৃতদেহের সৎকার করেছেন। ধর্ম, জাত, পরিচয় কিছুই তাঁকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। তাঁর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, একজন মানুষ যেন মৃত্যুর পর অন্তত সম্মানের সঙ্গে শেষ বিদায় পান।
ব্যক্তিগত থেকে মানবিক দায়িত্ব
পূজার এই অকল্পনীয় পথচলার শুরুটা কিন্তু জীবনের এক গভীর ব্যক্তিগত অধ্যায় দিয়ে। ২০২২ সালের ১৩ মার্চ তাঁর জীবনে নেমে আসে এক অন্ধকার দিন। চোখের সামনে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান তাঁর দাদা। সেই শোক সহ্য করতে না পেরে কোমায় চলে যান তাঁর বাবা। পরিবারের এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে পূজাই নিজের হাতে দাদার শেষকৃত্য সম্পন্ন করেন।
শ্মশানে দাঁড়িয়ে সেই দিনই তিনি উপলব্ধি করেন এক নির্মম সত্য—এই সমাজে এমন অনেক মানুষ আছেন, যাঁদের মৃত্যুর পরে কেউ নেই। কেউ নেই কাঁধে করে নিয়ে যাওয়ার, কেউ নেই শেষবারের মতো চোখের জল ফেলার। এই উপলব্ধিই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। তিনি সিদ্ধান্ত নেন, যাঁদের পাশে কেউ নেই, তাঁদের শেষযাত্রায় তিনি পাশে থাকবেন।
শুরু এক ভিন্ন পথচলা
প্রথম দিকে কাজটা সহজ ছিল না। পূজাকে নিজে থেকেই যোগাযোগ করতে হত বিভিন্ন সরকারি হাসপাতাল ও থানার সঙ্গে। কোথাও কোনও বেওয়ারিশ দেহ পড়ে থাকলে খবর নিয়ে তিনি নিজেই তার সৎকারের ব্যবস্থা করতেন। অনেক সময় নিজের খরচে, নিজের উদ্যোগেই সবকিছু করতে হত তাঁকে।
ধীরে ধীরে তাঁর কাজের কথা ছড়িয়ে পড়ে। আজ পরিস্থিতি এমন যে, কোনও অজ্ঞাতপরিচয় মৃতদেহ উদ্ধার হলে অনেক সময় পুলিশ বা হাসপাতাল থেকেই পূজাকে খবর দেওয়া হয়। একা হাতে তিনি এই দায়িত্ব পালন করে চলেছেন অবিরাম।
সমাজের বাধা, তবুও কঠিন সংকল্প
একজন মহিলা হয়ে এই ধরনের কাজ করা যায় তা এখনও আমাদের সমাজে অনেকের কাছে অস্বাভাবিক। ধর্মীয় ও সামাজিক নানা কুসংস্কার আজও এই কাজের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। অনেকেই মনে করেন, নারীদের শ্মশানে যাওয়া বা মৃতদেহ সৎকার করা উচিত নয়।
পূজাকেও এই মানসিকতার মুখোমুখি হতে হয়েছে বারবার। কখনও সমাজ, কখনও আবার কাছের আত্মীয়রা। তাঁর কাজকে ভালো চোখে দেখেন না অনেকেই। এমনকি তাঁর বিয়ের সম্বন্ধও ভেঙে গেছে শুধুমাত্র এই কারণে যে, তিনি মৃতদেহ সৎকারের কাজ করেন। তবুও তিনি থেমে যাননি। সমাজের এই সংকীর্ণ মানসিকতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে নিজের কাজ চালিয়ে গেছেন দৃঢ়ভাবে।
অর্থের অভাব, তবুও মানবতার জয়
এই বিশাল কাজের জন্য কোনও বড় আর্থিক সহায়তা পান না পূজা। বেশিরভাগ খরচই চলে তাঁর ঠাকুরদার পেনশনের টাকায়। সীমিত আয়ের মধ্যেও তিনি এই কাজ করে চলেছেন শুধুমাত্র মানবিক দায়বদ্ধতা থেকে।
একটি মৃতদেহের সৎকার মানে শুধু আগুনে দাহ করা নয়—এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে কাঠ, পরিবহন, প্রয়োজনীয় আনুষঙ্গিক খরচ। তবুও তিনি কখনও পিছিয়ে যাননি। তাঁর কাছে অর্থ নয়, মানুষের মর্যাদা বড়।
মানবতার এক বিরল উদাহরণ
আজকের দিনে যেখানে মানুষ অনেক সময় নিজের কাছের মানুষকেও ভুলে যায়, সেখানে পূজা শর্মার কাজ সত্যিই এক বিরল উদাহরণ। তিনি প্রমাণ করেছেন, মানবতা এখনও বেঁচে আছে—শুধু প্রয়োজন একজন সত্যিকারের মানুষের, যিনি সাহস করে এগিয়ে আসবেন।
পূজার কাজ শুধু মৃতদেহ সৎকার নয়। এটি এক গভীর বার্তা বহন করে। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রতিটি মানুষের জীবন যেমন মূল্যবান, তেমনি মৃত্যুর পরও তার সম্মান থাকা উচিত।
সমাজের প্রতি এক বড় প্রশ্ন
পূজার এই উদ্যোগ আমাদের সমাজের সামনে এক বড় প্রশ্নও তুলে ধরে। তা হল, কেন এখনও এত মানুষ নিঃসঙ্গতায় মারা যান? কেন তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ থাকে না? পরিবার, সমাজ, প্রশাসন—সব ক্ষেত্রেই এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি।
শ্মশানের আগুনের সামনে দাঁড়িয়ে যে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন পূজা শর্মা, সেই প্রতিজ্ঞা আজও অটুট। প্রচারের আলো থেকে দূরে থেকে তিনি নীরবে কাজ করে চলেছেন। তাঁর এই নিঃস্বার্থ উদ্যোগ শুধু প্রশংসার নয়, অনুপ্রেরণারও।
নিঃসঙ্গ মানুষের শেষযাত্রায় তিনি হয়ে উঠেছেন এক নির্ভরতার নাম। মৃত্যুর পরও যে সম্মান পাওয়া যায়—সেই বিশ্বাসটাকেই বাঁচিয়ে রেখেছেন তিনি। মানবতার এই আলোকবর্তিকা আমাদের শেখায়, বড় কিছু করতে গেলে সবসময় বড় মঞ্চের দরকার হয় না—প্রয়োজন শুধু বড় মনের।
এই নিষ্ঠা, এই সাহস, এই মানবিকতা—সব মিলিয়ে পূজা শর্মা আজ শুধু একজন মানুষ নন, তিনি আমাদের আজকের সমাজের দশভুজা ।
বিশেষ দ্রষ্টব্য :- এই খবর , দ্বারা আপডেট করা হয়েছে. এই খবরের সম্পূর্ণ দায়িত্ব হবে। www.khaborekhon.in অথবা সম্পাদকমন্ডলীর কোন দায় থাকবে না।

