AB Live News
কলকাতায় আন্তর্জাতিক জালিয়াতি চক্রের ‘সিমবক্স’ কারখানার পর্দাফাঁস, উধাও ৩ কোটি, উদ্ধার ২২৫০ সিম!

ফোনের ওপারে ‘সিবিআই অফিসার’। কণ্ঠে হুমকি— “অবৈধ পার্সেল পাচার মামলায় আপনার নাম জড়িয়েছে।” তারপর গ্রেফতারের ভয়, জাল নথি, ডিজিটাল সমন—এবং মুহূর্তে উধাও লক্ষ লক্ষ টাকা। এই পরিচিত সাইবার প্রতারণার আড়ালে যে কলকাতার বুকে গড়ে উঠেছিল পূর্ণাঙ্গ বেআইনি টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক, তা ভাবতেও পারেননি অভিজ্ঞ গোয়েন্দারাও। ১৫ ফেব্রুয়ারি, আমহার্স্ট স্ট্রিটের পাটোয়ারি বাগান লেনের একটি বাড়িতে হানা দিয়ে কলকাতা পুলিশ যে চিত্র দেখল, তা রীতিমতো চমকপ্রদ—আন্তর্জাতিক ভিওআইপি কলকে স্থানীয় মোবাইল কলে রূপান্তরিত করার বিশাল ‘টেলিকম গেটওয়ে’। কার্যত এক গোপন কল-কারখানা।

মামলার কেন্দ্রে প্রায় ৩ কোটির জালিয়াতি। তদন্তে উঠে আসে, অভিযোগকারী দুটি নম্বর থেকে ফোন পান। কিন্তু সেগুলি সাধারণ মোবাইল কল ছিল না। ব্যবহার করা হয়েছিল ‘সিম বক্স’ —এক বিশেষ যন্ত্র, যাতে একসঙ্গে শতাধিক সিম কার্ড বসিয়ে ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিদেশি কলকে স্থানীয় নম্বর হিসেবে দেখানো যায়।
ফলে, কলের প্রকৃত উৎস গোপন, আন্তর্জাতিক কল চার্জ ফাঁকি, টেলিকম নিয়ম লঙ্ঘন, তদন্তের পথ জটিল ইত্যাদি কারসাজি করা হত। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিদেশ থেকে পরিচালিত কলও স্থানীয় নম্বরের মতো দেখানো সম্ভব হয়, যা ভুক্তভোগীদের বিভ্রান্ত করে।
তদন্তে উঠে এসেছে— বাগুইআটি, রাজাবাজার ও এসপ্ল্যানেড এলাকায় সক্রিয় ছিল এই সিম বক্স চক্র।
মূল অভিযুক্ত আবির শেখ, যে আদতে বাংলাদেশি নাগরিক বলে দাবি তদন্তকারীদের। সে ব্যবহার করত ভার্চুয়াল নম্বর ও বাংলাদেশের ভিপিএন, যাতে অবস্থান চিহ্নিত করা না যায়।
১৪ ফেব্রুয়ারি ভোরে বিধাননগর কমিশনারেট বাগুইআটির হাতিয়ারা এলাকা থেকে তাকে একটি সচল সিম বক্স-সহ গ্রেফতার করে। তার জবানবন্দির সূত্র ধরেই পরদিন কলকাতা পুলিশের অভিযান।
উদ্ধার হয়—একাধিক বড় ক্ষমতার সিম বক্স মেশিন, ২,২৫০টি সিম কার্ড, ৯টি রাউটার, ১৭টি মোবাইল ফোন, একটি ল্যাপটপ (দূর থেকে নিয়ন্ত্রণের জন্য), সিসিটিভি ক্যামেরা, মালয়েশিয়ান মুদ্রা।
সিম বক্সগুলিতে একসঙ্গে বহু সক্রিয় সিম বসানো ছিল। সম্পূর্ণ অপারেশন দূর থেকে ল্যাপটপ ও রাউটারের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হত। গ্রেফতার হয়েছে আবিরের সহযোগী মহম্মদ আমজাদ (৩৮)।
তদন্তে উঠে এসেছে চক্রের সম্ভাব্য ‘মাস্টারমাইন্ড’ ত্রিপুরার বাসিন্দা বিপ্লব হোসেন। পাশাপাশি চুং ওয়েই কিয়াত নামে এক মালয়েশীয় নাগরিকের নামও সামনে এসেছে, যে চিকিৎসা ভিসায় ভারতে আসত বলে জানা গেছে।
কলকাতা পুলিশ এখন খতিয়ে দেখছে—এই নেটওয়ার্ক কতদিন ধরে সক্রিয় ছিল, আর কোন কোন রাজ্যে এদের শাখা রয়েছে, আন্তর্জাতিক সাইবার জালিয়াতি চক্রের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ কতটা গভীর।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সিম বক্স প্রতারণা শুধু আর্থিক জালিয়াতি নয়, এটি জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও হুমকি। কারণ—কলের উৎস ট্র্যাক করা কঠিন, সন্ত্রাসবাদী যোগাযোগেও অপব্যবহারের সম্ভাবনা এবং
টেলিকম খাতেও বিপুল রাজস্ব ক্ষতি হয়। ভারতে সিম বক্স পরিচালনা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং ভারতীয় টেলিগ্রাফ আইন ও তথ্যপ্রযুক্তি আইনের একাধিক ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
নাগরিকদের সতর্ক করে দিয়ে কলকাতা পুলিশের স্পষ্ট বার্তা—কোনও সরকারি সংস্থা কখনও হোয়াটসঅ্যাপ কল করে গ্রেফতারের ভয় দেখায় না। ডিজিটাল সমন পাঠানো হয় না।
চাপ সৃষ্টি করে টাকা চাওয়া হলে সঙ্গে সঙ্গে নিকটবর্তী থানায় জানান। মনে রাখুন—সরকারিভাবে ডাকা হলে লিখিত সমন বাধ্যতামূলক।
ডিজিটাল যুগে প্রতারণা যেমন স্মার্ট, তেমনই সংগঠিত। কলকাতার বুকে ধরা পড়া এই ‘কল-কারখানা’ প্রমাণ করল—অপরাধীরা প্রযুক্তিকে অস্ত্র বানালেও, গোয়েন্দাদের নজর এড়ানো সহজ নয়।
তদন্ত চলছে। সামনে আসতে পারে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য।
ছবি সৌজন্য : কলকাতা পুলিশ
বিশেষ দ্রষ্টব্য :- এই খবর editor , দ্বারা আপডেট করা হয়েছে. এই খবরের সম্পূর্ণ দায়িত্ব editor হবে। www.khaborekhon.in অথবা সম্পাদকমন্ডলীর কোন দায় থাকবে না।

