AB Live News
কলকাতা আছে কলকাতাতেই, গাজন শেষে বর্ষফলের সেকাল-একাল
চৈত্র সংক্রান্তির নীল আর গাজনের ঢাকের শব্দ মিলিয়ে যেতেই বাঙালির দুয়ারে কড়া নাড়ে পয়লা বৈশাখ। লোকবিশ্বাস বলে, চৈত্র ফুরোলে শিব-পার্বতী যখন কৈলাসে অবসরে বসেন, তখন উমার কৌতূহলী প্রশ্নের উত্তরে মহাদেব আগামীর ‘বর্ষফল’ ব্যাখ্যান করেন। এক সময় সেই মহাজাগতিক আড্ডার গল্পই মর্ত্যের বাঙালির ঘরে ঘরে পৌঁছে দিত পঞ্জিকার পাতা। উনিশ শতকে ছাপাখানার প্রসারের পর থেকেই মূলত সাধারণ মানুষের হাতে হাতে ঘুরতে শুরু করল আগামীর শুভাশুভ দিনলিপি। তবে সেই যুগের কলকাতার নববর্ষ উদ্যাপন আজকের মতো হুজুগমাতি বা জাঁকজমকপূর্ণ ছিল না; বরং তা ছিল অত্যন্ত ঘরোয়া, ভক্তিপূর্ণ এবং মাটির কাছাকাছি।
উনিশ শতকের বাংলায় পয়লা বৈশাখ মানেই ছিল সাতসকালে গোয়ালঘরে ‘ভগবতী পুজো’। আজকের আধুনিক নাগরিক জীবনে ভাবা কঠিন হলেও, বিশ শতকের প্রথম দশকেও খোদ তিলোত্তমার বহু অভিজাত এবং সাধারণ গৃহস্থবাড়িতে নিজস্ব গোয়ালঘর ও গরু থাকত। আর সেই গোয়ালঘর পরিষ্কার করেই শুরু হতো বছরের প্রথম দিনটি। বাড়ির মহিলারা নিপুণ হাতে গোয়াল নিকিয়ে আতপ চাল, মন্ডা, ফল, ফুল আর চন্দন দিয়ে পুজোর ডালি সাজাতেন। সকাল হতে না হতেই পুরোহিত মশাই আসতেন তড়িঘড়ি মন্ত্র পড়ে পুজো সারতে। কারণ সেই দিন তাঁর হাতে সময়ের বড় অভাব; এক বাড়ি সেরে তাঁকে ছুটতে হতো অন্য যজমানবাড়িতে। পুজোর শেষে দক্ষিণা আর ভোগের উপাচার নিয়ে বাড়ির ছোটরা রওনা হতো বামুনবাড়ির দিকে।
সেকালের নববর্ষে আজানুলম্বিত কোঁচানো ধুতি আর তসরের পাঞ্জাবি পরে বাবুদের চটি চটচটানি শব্দে উত্তর কলকাতার গলিগুলো মুখরিত হয়ে উঠত। তবে হালখাতার ঘটাপটা তখন মূলত ছিল ব্যবসায়ী মহলে। সাধারণ মানুষের কাছে দিনটি ছিল আত্মীয়-পরিজনদের সঙ্গে কুশল বিনিময়ের। চৈত্র শেষের তপ্ত দুপুরে পঞ্জিকার পাতা উল্টে ‘গজভুক্তি’ না ‘মৎস্যভুক্তি’—অর্থাৎ এ বছর ফলন কেমন হবে বা বৃষ্টির পরিমাণ কেমন থাকবে, তা নিয়ে চলত প্রবীণদের দীর্ঘ আলোচনা। পঞ্জিকার সেই ‘বর্ষফল’ ছিল অনেকটা আজকের আবহাওয়ার পূর্বাভাস আর শেয়ার বাজারের পূর্বাভাসের সংমিশ্রণ।
কালের নিয়মে কলকাতার অন্দরমহল থেকে গোয়ালঘর মুছে গিয়েছে, বদলেছে নববর্ষের সংজ্ঞাও। আজ হালখাতার মিষ্টির প্যাকেট, নতুন জামার গন্ধ আর মাল্টিপ্লেক্স বা রেস্তোরাঁর ভুরিভোজের মাঝে সেই ঘরোয়া ‘ভগবতী পুজো’ কিংবা একাসনে বসে বর্ষফল শোনার রোমাঞ্চ কেবল ইতিহাসের পাতাতেই রয়ে গিয়েছে। আধুনিকতার ভিড়েও কলকাতার পুরনো পাড়াগুলোর অন্দরে আজও কোথাও যেন সেই ম্লান হয়ে আসা স্মৃতির সুগন্ধটুকু লেগে আছে। অমল ধবল সকালে নতুন পঞ্জিকার গন্ধ শুঁকে আজও কোনও বৃদ্ধ হয়তো আক্ষেপ করে বলেন, “আগেকার সেই দিনগুলোই ছিল আলাদা, যেখানে আড়ম্বর কম ছিল কিন্তু আন্তরিকতা ছিল ষোলো আনা।”
বিশেষ দ্রষ্টব্য :- এই খবর Khabor Ekhon , দ্বারা আপডেট করা হয়েছে. এই খবরের সম্পূর্ণ দায়িত্ব Khabor Ekhon হবে। www.khaborekhon.in অথবা সম্পাদকমন্ডলীর কোন দায় থাকবে না।

