AB Live News
জাম বেশি খাচ্ছেন? জানেন কী বিপদ হতে পারে?
গ্রীষ্মের তীব্র দাবদাহের পর বর্ষার আগমন ঘটতেই বাঙালির ফলের ডালায় এক বিশেষ জায়গা করে নেয় কুচকুচে কালো, টক-মিষ্টি স্বাদের জাম। পটাশিয়াম, ফসফরাস, ক্যালশিয়াম এবং ম্যাগনেশিয়ামের মতো বহুবিধ খনিজ উপাদানে ঠাসা এই ছোট ফলটি এক নিমেষেই শরীরের ক্লান্তি দূর করে দিতে পারে। বিশেষত, রক্তে হিমোগ্লোবিন বাড়ানো থেকে শুরু করে ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষেত্রে জামের জুড়ি মেলা ভার। বাজারে ইতিমধ্যেই এই লোভনীয় ফলের দেখা মিলতে শুরু করেছে। কিন্তু চিকিৎসকেরা সতর্ক করে বলছেন, অতিরিক্ত মাত্রায় জাম খাওয়া কিংবা ভুল নিয়ম মেনে এই ফল গ্রহণ করলে শরীরে মারাত্মক সব জটিলতা দেখা দিতে পারে। পুষ্টিবিদ ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, জামের পুরো পুষ্টিগুণ যদি সঠিক উপায়ে পেতে হয় এবং শরীরকে সুস্থ রাখতে হয়, তবে জাম খাওয়ার সময় এবং তার ঠিক পরে কয়েকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম অবশ্যই মেনে চলতে হবে। অসচেতনতার কারণে পুষ্টিকর এই ফলই শরীরের জন্য বিষ হয়ে উঠতে পারে।
সবচেয়ে সাধারণ যে ভুলটি মানুষ করে থাকেন, তা হল জাম খাওয়ার পর পরই তীব্র জলতেষ্টা পাওয়া এবং সঙ্গে সঙ্গে জল পান করা। বিশেষজ্ঞরা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, জাম খাওয়ার পর পরই তীব্র তেষ্টা পেলেও কখনও জল খাওয়া উচিত নয়। জাম খাওয়ার ঠিক পরে জল পান করলে শরীরের পরিপাক ক্রিয়ায় তীব্র বিঘ্ন ঘটে। এর ফলে ডায়েরিয়া, তীব্র বদহজম এবং পেটের নানাবিধ গোলমাল দেখা দিতে পারে। তাই জাম খাওয়ার পর জল পানের ক্ষেত্রে অন্তত পক্ষে আধ ঘণ্টা অপেক্ষা করা বাধ্যতামূলক। চিকিৎসকদের মতে, এই সময়ের ব্যবধানটুকু বজায় না রাখলে পেটের ভেতরের অম্ল ও ক্ষারের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়, যা হজম প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত করে তোলে।
একই রকম ভাবে, সকালের খাদ্যতালিকায় বা খাদ্যাভ্যাসে অনেকেরই একটি মারাত্মক ভুল প্রবণতা লক্ষ করা যায়। ঘুম থেকে উঠেই বা খালি পেটে জাম খাওয়ার অভ্যাস থাকলে তা আজই বদলানোর পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকেরা। টক-মিষ্টি স্বাদের এই ফলটিতে প্রচুর পরিমাণে প্রাকৃতিক অ্যাসিড থাকে। ফলে খালি পেটে এটি শরীরে প্রবেশ করলে পাকস্থলীতে মারাত্মক রকমের অ্যাসিডিটি ও অম্বল তৈরি হতে পারে। দীর্ঘ দিন ধরে খালি পেটে জাম খাওয়ার এই অভ্যাস বজায় রাখলে তা গ্যাস্ট্রিক আলসারের মতো গুরুতর রোগের কারণ হতে পারে। তাই সকালের জলখাবার বা অন্য কোনও হালকা খাবার খাওয়ার পরেই জাম খাওয়া স্বাস্থ্যের পক্ষে নিরাপদ।
জামের ক্ষতিকর প্রভাবের তালিকা এখানেই শেষ নয়। দুগ্ধজাত পদার্থের সঙ্গে জামের রাসায়নিক বিক্রিয়া শরীরের পক্ষে অত্যন্ত ক্ষতিকর। জাম খাওয়ার ঠিক পরেই দুধ, দই বা পনিরের মতো খাবার কোনও ভাবেই ছোঁয়াবেন না। জামের মধ্যে থাকা অ্যাসিডিক উপাদান দুধ বা দুগ্ধজাত খাবারের প্রোটিনের সঙ্গে মিশলে তা পেট ফোলার সমস্যা, গ্যাস এবং তীব্র পেটের যন্ত্রণার সৃষ্টি করে। এই ধরনের খাবারের মেলবন্ধন পরিপাকতন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতি করে। অতএব, জাম খাওয়ার পর এই জাতীয় কোনও খাবার খেতে চাইলে ন্যূনতম তিরিশ মিনিট থেকে এক ঘণ্টা বিরতি দেওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন।
অনেকেই আবার জামের বহুমুখী উপকারিতার কথা শুনে থালা ভরে অতিরিক্ত পরিমাণে এই ফলটি খেতে শুরু করেন। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, লোভের বশে অতিরিক্ত পরিমাণে জাম খাওয়া ডেকে আনতে পারে অন্য এক বড় বিপদ। উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন নিয়ন্ত্রণে জামের ভূমিকা দারুণ এবং অত্যন্ত প্রশংসনীয় হলেও, এটি বেশি পরিমাণে খেলে রক্তচাপ প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি কমে যেতে পারে। যার ফলে রক্তচাপ স্বাভাবিকের নিচে নেমে গিয়ে নিম্ন রক্তচাপ বা হাইপোটেনশনের সমস্যা তৈরি হতে পারে। নিম্ন রক্তচাপের কারণে মাথা ঘোরা, দুর্বলতা এবং হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হওয়া অসম্ভব নয়।
তা ছাড়া, জামে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি থাকে। সাধারণ মাত্রায় ভিটামিন সি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ালেও, অতিরিক্ত ভিটামিন সি শরীরে প্রবেশ করলে তা প্রস্রাবের মাধ্যমে অক্সালেট আকারে নির্গত হয়। এই অক্সালেট শরীরে ক্যালশিয়ামের সঙ্গে যুক্ত হয়ে কিডনিতে পাথর বা স্টোন তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে, জাম রক্তে শর্করার মাত্রা অত্যন্ত দ্রুত হ্রাস করে। ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য এটি উপকারি হলেও, প্রয়োজনের অতিরিক্ত জাম খেলে তা হঠাৎ করে রক্তের গ্লুকোজের মাত্রা এতটাই কমিয়ে দেয় যে রোগী হাইপোগ্লাইসেমিয়ার শিকার হতে পারেন। রক্তের শর্করা অতিরিক্ত কমে যাওয়া জীবনের পক্ষে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের আরও সংযোজন, যাদের শরীরে বাতের ব্যথা রয়েছে কিংবা রক্ত জমাট বাঁধা সংক্রান্ত জটিলতা বা অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিসের মতো রোগ রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে জাম এড়িয়ে চলাই মঙ্গলজনক। জামে থাকা কিছু উপাদান এই সমস্ত শারীরিক সমস্যাকে আরও উস্কে দিতে পারে এবং যন্ত্রণার মাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে। চিকিৎসকদের মূল বক্তব্য অত্যন্ত স্পষ্ট, মরসুমের এই ফলটি অবশ্যই দৈনন্দিন ডায়েটে রাখা উচিত, তবে তা হতে হবে পরিমাণমতো এবং নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে। অতিরিক্ত লোভের বশে কিংবা অসতর্কভাবে বেশি জাম খেয়ে নিজের অজান্তেই শরীরের বড় বিপদ ডেকে আনা কোনও বুদ্ধিমত্তার কাজ নয়। সুস্থ থাকার জন্য পরিমিত বোধ ও সচেতনতাই একমাত্র চাবিকাঠি।
বিশেষ দ্রষ্টব্য :- এই খবর Khabor Ekhon , দ্বারা আপডেট করা হয়েছে. এই খবরের সম্পূর্ণ দায়িত্ব Khabor Ekhon হবে। www.khaborekhon.in অথবা সম্পাদকমন্ডলীর কোন দায় থাকবে না।

