Khabor Ekhon
সত্যতা যাচাই করে তবেই খবর খবরের ভেতরের খবর
Breaking News

পশুজবাইয়ে ছাড়ের আর্জি জানিয়ে হাই কোর্টে মামলা

0 876,348,999

 রাজ্যে আসন্ন কোরবানি ইদের প্রাক্কালে পশুজবাই সংক্রান্ত রাজ্য সরকারের কড়া নির্দেশিকাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে কলকাতা হাই কোর্টের দ্বারস্থ হল তৃণমূল কংগ্রেস। রাজ্যের ক্ষমতাশীল নতুন সরকারের জারি করা এই নির্দেশিকায় উৎসবের মরসুমে কিছু বিশেষ ছাড় দেওয়ার আর্জি জানিয়ে একাধিক জনস্বার্থ মামলা দায়ের করা হয়েছে। এই মামলাগুলির মধ্যে অন্যতম প্রধান একটি মামলা দায়ের করেছেন রঘুনাথগঞ্জের তৃণমূল বিধায়ক আখরুজ্জামান। আগামী বৃহস্পতিবার এই সংক্রান্ত সমস্ত মামলার একসঙ্গে শুনানি হবে বলে জানিয়েছে হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল এবং বিচারপতি পার্থসারথি সেনের ডিভিশন বেঞ্চ। বুধবার আদালতের তরফে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, একই বিষয়ে একাধিক মামলা দায়ের হওয়ায় সব কটি আর্জি একসঙ্গে শুনেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই পশুহত্যা সংক্রান্ত পুরনো আইনকে অত্যন্ত কঠোরভাবে কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ১৯৫০ সালের প্রাণিসম্পদ আইন অনুযায়ী বেশ কিছু কড়া নিয়ম নতুন করে বলবৎ করেছে শুভেন্দু অধিকারীর সরকার। এই সরকারি নির্দেশিকায় সাফ জানানো হয়েছে যে, প্রশাসনের আগাম ও লিখিত অনুমোদন ছাড়া কোনওভাবেই কোনও গবাদি পশু হত্যা করা যাবে না। একই সঙ্গে নির্দেশিকায় কঠোরভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, যে সমস্ত গবাদি পশুর বয়স ১৪ বছর পূর্ণ হয়নি, তাদের কোনও অবস্থাতেই জবাই করা যাবে না। তা ছাড়াও সাধারণ মাংস কাটার ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট স্থানীয় কর্তৃপক্ষ কিংবা সামগ্রিকভাবে পশ্চিমবঙ্গের প্রাণিসম্পদ দফতরের লিখিত অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সরকারের এই আকস্মিক ও কঠোর নির্দেশিকার জেরে রাজ্যের সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকাগুলিতে তীব্র চাঞ্চল্য ও ‘অস্থিরতা’ তৈরি হয়েছে। ইদের ঠিক মুখে এমন সিদ্ধান্তের ফলে উৎসবের আয়োজন নিয়ে বড়সড় ‘অনিশ্চয়তা’ দেখা দিয়েছে বলে দাবি বিভিন্ন মহলের। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে ইতিপূর্বেই প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অধীর রঞ্জন চৌধুরী থেকে শুরু করে আইএসএফ চেয়ারম্যান তথা বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকী মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পুনর্বিবেচনার আবেদন জানিয়েছেন।

এই আবহেই বিষয়টি এবার বড়সড় আইনি লড়াইয়ের রূপ নিল। হাই কোর্টে দায়ের হওয়া জনস্বার্থ মামলায় মূল আবেদনকারী তৃণমূল বিধায়ক আখরুজ্জামানের পক্ষে সওয়াল করতে এবং সংহতি জানাতে আদালতে উপস্থিত ছিলেন কৃষ্ণনগরের তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্রও। আদালতের বাইরে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে মহুয়া মৈত্র রাজ্য সরকারের এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি জানান, গত ১৩ মে রাজ্য সরকার আচমকা গবাদি পশু জবাই নিয়ে যে কঠোর বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে, তা বকরি ইদের মতো একটি বড় ধর্মীয় উৎসবের মুখে সাধারণ মানুষকে চূড়ান্ত সমস্যায় ফেলেছে। মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে এই উৎসবের ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক গুরুত্ব অপরিসীম। তিনি আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, সংশ্লিষ্ট ১৯৫০ সালের আইনের ১২ নম্বর ধারায় উৎসব বা বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে কিছু ছাড় দেওয়ার স্পষ্ট বিধান রয়েছে। সেই আইনি ধারাকে সামনে রেখেই তারা আদালতের কাছে বিশেষ ছাড়ের আর্জি জানাচ্ছেন। মহুয়া মৈত্র আরও বলেন, “আমরা ধর্মীয় ভাবাবেগকে সম্মান জানিয়ে বলছি, এই উৎসবের দিনগুলিতে যদি গরুকে সম্পূর্ণ বাদও দেওয়া হয়, তবুও যেন অন্তত মোষ অথবা বলদ কোরবানির অনুমতি দেওয়া হয়। প্রশাসনের এই অনমনীয় মনোভাবের কারণে সাধারণ মানুষের উৎসবের আনন্দ মাটি হতে বসেছে।”

সাংসদ মহুয়া মৈত্র শুধুমাত্র ধর্মীয় ভাবাবেগের কথাই বলেননি, বরং এই সিদ্ধান্তের ফলে রাজ্যের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওপর যে মারাত্মক আঘাত আসবে, তাও সবিস্তারে তুলে ধরেছেন। তিনি দাবি করেন, গরুজবাই বা পশুহত্যার ওপর এই ধরনের আচমকা নিষেধাজ্ঞা জারি হলে কেবল একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের মানুষই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না, বরং হিন্দু সম্প্রদায়ের বহু মানুষও চরম আর্থিক সংকটের মুখে পড়বেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, রাজ্যের গ্রামীণ অর্থনীতিতে পশুপালন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জীবিকা। বহু দরিদ্র হিন্দু চাষি ও ব্যবসায়ী সারা বছর ধরে অত্যন্ত কষ্ট করে এই কোরবানি ইদের বাজারকে লক্ষ্য রেখে গরু, মোষ বা বলদ লালন-पालन করেন। ইদের মরসুমে সেগুলি বিক্রি করে তাঁদের সারা বছরের উপার্জনের একটা বড় অংশ আসে। সরকারের এই আকস্মিক সিদ্ধান্তের ফলে সেই সব পশু ব্যবসায়ীরা তাঁদের গবাদি পশু বিক্রি করতে পারছেন না, যার ফলে তাঁরাও এক চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে দাঁড়িয়েছেন। ফলে এই আইন বা নির্দেশিকা কেবল ধর্মীয় নয়, বরং রাজ্যের সার্বিক গ্রামীণ অর্থনীতির ওপর এক বড় ধাক্কা।

মামলার মূল আবেদনকারী তথা তৃণমূল বিধায়ক আখরুজ্জামান কোরবানির আসল ধর্মীয় তাৎপর্য ব্যাখ্যা করে এই নির্দেশিকার বিরোধিতা করেছেন। তিনি বলেন, কোরবানি হল ইসলাম ধর্মের অন্যতম পবিত্র এবং বাধ্যতামূলক একটি রীতি। এই রীতির মূল কথাই হল ত্যাগ। ধর্মে স্পষ্ট বলা আছে, নিজের অত্যন্ত প্রিয় কোনও পোষ্যকে সুস্থ ও সবলভাবে নিজের হাতে লালন-পালন করতে হয়। দীর্ঘ সময় ধরে যত্নের মাধ্যমে সেই পশুর প্রতি মানুষের মনে গভীর এক ভালবাসা ও মায়া তৈরি হয়। এরপর সেই প্রিয় পশুটিকে আল্লাহর উদ্দেশ্যে উৎসর্গ বা কোরবানি করতে হয়। এটাই এই উৎসবের মূল দর্শন। রাজ্যের বহু মানুষ এই পবিত্র নিয়ম পালন করার জন্য বছরের পর বছর ধরে বাড়িতে পশু প্রতিপালন করে আসছেন। কিন্তু গত ১৩ মে রাজ্য সরকারের তরফ থেকে যে আকস্মিক নির্দেশিকা জারি করা হল, তাতে এই সব সাধারণ মানুষ চরম বিপাকে পড়েছেন। তাঁদের দীর্ঘদিনের প্রস্তুতি ও ধর্মীয় আবেগ এক লহমায় ধূলিসাৎ হতে চলেছে। প্রশাসনের এই সংবেদনহীনতার বিরুদ্ধেই তাঁরা আদালতের দ্বারস্থ হতে বাধ্য হয়েছেন।

বিষয়টির সংবেদনশীলতা এবং গুরুত্ব বিবেচনা করে কলকাতা হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল এবং বিচারপতি পার্থসারথি সেনের ডিভিশন বেঞ্চ মামলাটি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে গ্রহণ করেছে। বুধবার আদালতের পক্ষ থেকে জানানো হয়, যেহেতু একই বিষয়ে একাধিক জনস্বার্থ মামলা দায়ের হয়েছে এবং প্রতিটির মূল দাবিই প্রায় এক, তাই সমস্ত মামলাকে একত্রিত করে আগামী ২১ মে, অর্থাৎ বৃহস্পতিবার বিস্তারিত শুনানি হবে। এখন দেখার, আদালতের হস্তক্ষেপে এই নির্দেশিকায় কোনও অন্তর্বর্তী ছাড় মেলে কি না, নাকি সরকারের কড়া আইনই বহাল থাকে। সমগ্র রাজ্যের নজর এখন বৃহস্পতিবারের হাই কোর্টের এই হাইপ্রোফাইল শুনানির দিকেই আটকে রয়েছে।

Note :- ক্রমাগত অন্যান্য আপডেট পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন ।

বিশেষ দ্রষ্টব্য :- এই খবর Khabor Ekhon , দ্বারা আপডেট করা হয়েছে. এই খবরের সম্পূর্ণ দায়িত্ব Khabor Ekhon হবে। www.khaborekhon.in অথবা সম্পাদকমন্ডলীর কোন দায় থাকবে না।

PostBodyBottom

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

E-Paper